মো. তারিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম

আগামী ছয় মাসে বরিশালসহ সারাদেশে বাড়তি তাপজনিত কারণে অন্তত ৬০০ জনের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। যারমধ্যে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম রয়েছে উচ্চঝুঁকিতে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের এক নতুন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান আজ, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর কারণে বিশ্বব্যাপী চার লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ, এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ৬০০ জনের মধ্যে শুধু খুলনাতেই আনুমানিক ৩১০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে, যা জাতীয় হিসাবের প্রায় অর্ধেক। খুলনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মাস হিসেবে নভেম্বরকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে একক মাসে প্রায় ১১০ জনের বাড়তি মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।

লালচে কালিতে চিহ্নিত দক্ষিনাঞ্চল। ইমপ্যাক্ট ল্যাব ম্যাপে
বরিশাল অঞ্চলকেও প্রতিবেদনে খুলনা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বরিশালের জন্য আলাদা মাসভিত্তিক সংখ্যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে পাইনি। এ বিষয়ে ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের পূর্ণাঙ্গ ডেটা প্রকাশিত হলে বরিশালের নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে আমরা আলাদাভাবে প্রতিবেদন করব।
তবে প্রকাশি হিট ম্যাপে দেখা যাচ্ছে, বরিশাল অঞ্চলে বিপদজনক লালচে রঙ বিদ্যমান। যা ইঙ্গিত করে যে পুরো এলাকাটিই ঝুঁকিতে রয়েছে।
কেন এই ঝুঁকি
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে, এবং অস্বাভাবিক গরম দিনের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪ শতাংশ বেশি হতে পারে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, সাড়ে চার লাখের এই সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়—এর পেছনে রয়েছেন বাবা-মা, সন্তান, প্রতিবেশী ও কর্মজীবী মানুষ, যাঁরা প্রতিদিনের জীবনযাপন করছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনের আরেক লেখক, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলির অধ্যাপক তাম্মা কার্লেটন জানান, জরুরি প্রস্তুতি ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা এই বছরের অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এমন তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এখনই এগোতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডব্লিউএমও অবশ্য সতর্ক করেছে, এল নিনোর তীব্রতাই কোনো নির্দিষ্ট দেশের আবহাওয়ার একমাত্র নির্ধারক নয়—ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের অবস্থাও স্থানীয় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতে প্রভাব ফেলে।
ঝুঁকি শুধু তাপেই সীমাবদ্ধ নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল এল নিনো বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে দিতে পারে—কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এতে কৃষি, পানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগস্টে সতর্ক করেছিল, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃদ্ধ, খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমিক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সুবিধাবঞ্চিত এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা-সুবিধা থাকা মানুষ তাপজনিত ঝুঁকিতে বেশি থাকেন বলে জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। উন্নত তাপ পূর্বাভাস, শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ এই ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন।
গবেষণা অনুযায়ী প্রক্ষেপণের সময়সীমা সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত হলেও, উত্তর গোলার্ধের কিছু অঞ্চলে বাড়তি তাপজনিত মৃত্যুহার ২০২৭ সালের জুন-জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
সূত্র: ইমপ্যাক্ট ল্যাব, দ্য গার্ডিয়ান
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন