Advertise top
বিদেশ

নেপালে ভূমিধসে ভয়াবহ বন্যা: নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ প্রায় ৪০০ বিদেশি পর্যটকসহ

বরিশাল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ আগষ্ট ২০২৬, ০৪:১৪ এএম    

নেপালে ভূমিধসে ভয়াবহ বন্যা: নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ প্রায় ৪০০ বিদেশি পর্যটকসহ
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশি নদীর আকস্মিক বন্যায় ধ্বংস হওয়া একটি জনবসতি এলাকা। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্ট

নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ভোতেকোশি নদীতে বুধবার সকালে আকস্মিক এক বন্যায় অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন, যাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছেন। কাঠমান্ডু পোস্টের সবশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সীমান্তের কাছে একটি ভূমিধসের জেরে সৃষ্ট এই বন্যাকে নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৪৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। উল্লেখ্য, দিনভর পরিস্থিতির তথ্য বারবার হালনাগাদ হয়েছে—সকালের দিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মৃতের সংখ্যা ৮ থেকে ২২ জন বলা হলেও বিকেলে তা ৭২ এবং সন্ধ্যায় ৯৫-এ পৌঁছায়, রাতে কাঠমান্ডু পোস্ট তা ১৫৭ বলে জানিয়েছে। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

যেভাবে শুরু হয় বিপর্যয়

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি ভূমিধস ভোতেকোশির উপনদী লেন্দেতে বাঁধের মতো জমাট বেঁধে যাওয়ার পর হঠাৎ তা ভেঙে পড়ে এবং প্রবল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়াগড়ির কাছে তিমুরে বাজার এলাকায় প্রথম আঘাত হানে এই বন্যা, যেখানে শত শত মানুষের বসতি ছিল। আকাশে বৃষ্টি না থাকায় এলাকাবাসী কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এই দুর্যোগের মুখে পড়েন।

 

রাসুয়ার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ঢুংগানা কাঠমান্ডু পোস্টকে জানান, প্রথমে তিনি ভূমিকম্প হয়েছে ভেবেছিলেন, বাইরে বেরিয়ে দেখেন প্রায় একশ মিটার উঁচু জলের দেয়াল ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বাজারের দিকে ধেয়ে আসছে। তিনি জানান, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাজার ভেসে যায় এবং শুল্ক চৌকিতে অপেক্ষমাণ তিনশোর বেশি যানবাহন ও ট্রাক ভেসে যায়।

 

সিএনএন ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) বিশেষজ্ঞ সাসওয়াতা সান্যালের বরাতে বলা হয়েছে, ভূমিধসটি সম্ভবত ভোতেকোশি নদীকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখার পর হঠাৎ বিপুল পানি নিচের দিকে ছেড়ে দেয়, যাকে তিনি হিমালয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির একটি "ধারাবাহিক বিপর্যয়" হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি

বন্যায় ন'টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সমসংখ্যক ব্যাংক শাখা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কাঠমান্ডু পোস্ট। প্রাথমিক হিসাবে ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক ভেসে গেছে। নুয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানান, সোল থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত শত শত বাড়িঘর ভেসে গেছে এবং অনেক বৃদ্ধ ও শিশু এখনো নিখোঁজ। বিদুর পৌরসভা-৭-এর বাসিন্দা গোকর্ণ অধিকারী বলেন, তার গ্রামে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট নেই এবং দূর থেকে অক্ষত দেখানো বাড়িগুলোও কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে।

 

উদ্ধার তৎপরতা ও প্রতিবন্ধকতা

কাঠমান্ডু পোস্টের পরবর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালি সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত ৮৮ জনকে উদ্ধার করেছে, যাদের মধ্যে ১৩ জনকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর চারটিসহ মোট ১২টি হেলিকপ্টার নিয়োজিত থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার ফ্লাইট বারবার ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনা মুখপাত্র রাজারাম বাসনেত। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

 

পূর্বাভাস ব্যবস্থার ঘাটতি

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, আগাম তথ্যের অভাবেই এত বড় প্রাণহানি ঘটেছে। রাসুয়া জেলা প্রশাসন কার্যালয় জানিয়েছে, তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া এই বন্যা সম্পর্কে তাদের কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। ভোতেকোশি নদীর উজানে বসানো স্বয়ংক্রিয় বন্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোও বন্যায় ভেসে গেছে, ফলে সেগুলো কোনো সতর্কবার্তা পাঠাতে পারেনি বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ জলবিজ্ঞানী বিনোদ পরাজুলি।

 

তিনি জানান, রাসুয়া জেলা প্রশাসন ও জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে তথ্য পাওয়ার চার মিনিটের মধ্যেই নিচের এলাকাগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়, যদিও ততক্ষণে বন্যা রাসুয়ার বড় অংশে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে তিনি জানান, নুয়াকোটসহ নিম্নাঞ্চলে পাঠানো সতর্কবার্তার কারণে সম্ভবত কয়েকশ মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।

 

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান নির্বাহী অনিল পোখরেল কান্তিপুরকে জানান, অতীতেও চীনের দিক থেকে উৎপত্তি হওয়া বন্যায় একই সমস্যা দেখা গেছে, কিন্তু বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তিনি বলেন, নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কার্যকর পূর্বাভাস আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে না তুললে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

 

নেপাল-চীন সমন্বয়

বন্যার পর নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের মধ্যে বুধবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সীমান্তের ওপারে পানির স্তর বাড়তে শুরু করলেই নেপালকে জানানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে চীন। উল্লেখ্য, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জরুরি সাড়াদান সহযোগিতা নিয়ে ২০১৯ সালে নেপাল ও চীনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, তবে বুধবারের ঘটনায় সেই চুক্তির কার্যকারিতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

অতীতেও ঘটেছে একই দুর্যোগ

গত বছরের ৮ জুলাই একই লেন্দে নদীতে বন্যায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী মিতেরি সেতু ভেসে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, রাসুয়াগড়ি সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে তিব্বতে সংঘটিত একটি ভূমিধসই এবারের বন্যার কারণ। নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিখোঁজদের সংখ্যা বিবেচনায় এই বন্যা ১৯৯৩ সালে সারলাহি, রউতাহাট ও মকওয়ানপুরে ১৪০০ জনের প্রাণহানি ঘটানো বন্যার পর নেপালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, সিএনএন, আল জাজিরা, রয়টার্স

 


মন্তব্য লিখুন


Ish Brand

সর্বশেষ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal