Advertise top
স্পেশাল

১০০ বছর আগের কুয়াকাটার ভিডিও বিস্তারিত বিশ্লেষন

মো. তারিকুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৬ আগষ্ট ২০২৬, ১০:০৫ পিএম    

১০০ বছর আগের কুয়াকাটার ভিডিও বিস্তারিত বিশ্লেষন
বিএফআই আর্কাইভের তথ্যের স্ক্রিনশট।

কুয়াকাটা সৈকতের প্রায় এক শতাব্দী আগের একটি দুর্লভ ফুটেজ কালারাইজ ও আপস্কেল করে প্রকাশ করেছিল বরিশাল নিউজ ডটকম। প্রকাশের পর ভিডিওর প্রকৃত বয়স, দৃশ্যে দেখা মানুষদের চেহারা এবং একটি রহস্যময় দণ্ড নিয়ে পাঠকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নগুলো যৌক্তিক হওয়ায় নিজেদের অনুসন্ধান আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছে বরিশাল নিউজ ডটকম।

 

ভিডিওটি কি সত্যিই এত পুরনো?

এই ফুটেজের মূল উৎস ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের (BFI) সংরক্ষণাগার। সেখানে "Tours in Southern Bengal - In the Sunderbans" শিরোনামের এই ফিল্মটি সংরক্ষিত আছে, যার তথ্য এখানে দেখা যাবে  আর্কাইভের নথি অনুযায়ী ফিল্মটি ১৯৩৫ সালের দিকে ক্যাটালগভুক্ত করা হয়, আর ধারণকাল দেখানো হয়েছে ১৯৩০-এর দশকের প্রথমার্ধ।

 


মূল ফুটেজটি সাদাকালো, দানাদার এবং নীরব চলচ্চিত্র হিসেবেই সংরক্ষিত আছে। বরিশাল নিউজ যে অংশটুকু প্রকাশ করেছিল, সেটি এই মূল ফুটেজেরই একটি অংশ, যা কালারাইজেশন ও আপস্কেলিং প্রযুক্তি দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে যাতে দৃশ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

 

একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। আধুনিক এআই-নির্ভর আপস্কেলিং ও কালারাইজেশন প্রযুক্তি অনেক সময় পুরনো ফুটেজের টেক্সচার ও রঙে এমন মসৃণতা যোগ করে দেয়, যা দেখতে অনেকটা আধুনিক মনে হতে পারে। এ কারণেই কিছু দর্শকের কাছে ফুটেজটি ১৯৮৫-৯০ সালের মনে হয়েছে।

 

কিন্তু ফুটেজের প্রকৃত বয়স নির্ধারিত হয় তার মূল, অপ্রক্রিয়াজাত উৎস থেকে, প্রক্রিয়াজাত সংস্করণের চাকচিক্য থেকে নয়। মূল উৎসের ক্যাটালগ তথ্য অনুযায়ী এটি ১৯৩০-এর দশকেরই ফুটেজ।

 

প্রশ্নবিদ্ধ সেই দণ্ডের রহস্য

ভিডিওতে এক তরুণকে একটি লম্বা, সরু ও হালকা রঙের দণ্ড হাতে দেখা গেছে। কারও কারও কাছে এটি প্লাস্টিকের পাইপের মতো মনে হয়েছে।

 

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ে নৌকার মাস্তুল বা লগি হিসেবে একধরনের চিকন, খোসা ছাড়ানো বাঁশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রঙ ও আলোর প্রতিফলনে এই বাঁশ অনেকটা মসৃণ সাদা রডের মতো দেখাতে পারে, বিশেষত কালারাইজেশনের পর দেখলে। কুয়াকাটাসহ দক্ষিণ উপকূলের নৌকায় এই ধরনের বাঁশের ব্যবহার বহু পুরনো ও সুপরিচিত একটি চর্চা।

 

স্থানীয়দের চেহারা ও সাজপোশাক নিয়ে প্রশ্ন

একাধিক পাঠক মন্তব্য করেছেন, ভিডিওতে দেখা মানুষদের শারীরিক গঠন কুয়াকাটার সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে এই পর্যবেক্ষণ ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করছে বরিশাল নিউজ।

 

পোশাক বুননে প্রসিদ্ধ রাখাইনরা


ঐতিহাসিকভাবে কুয়াকাটা ও তার সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় রাখাইন জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য জনবসতি ছিল। আঠারো ও ঊনিশ শতকে এই জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বিস্তারিত জানা যাবে দ্য ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদনে এবং বাংলা উইকিপিডিয়ার কুয়াকাটা রাখাইন পল্লী নিবন্ধে

 

রাখাইনদের নিজস্ব পোশাক-বুনন ও পরিধানরীতি বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা। তাই ভিডিওতে দেখা মানুষদের সাজপোশাক ও অবয়বে যে ভিন্নতা লক্ষ করা গেছে, তা রাখাইন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

 

এটি যে কুয়াকাটা, তার প্রমাণ কী?

এখানে স্বচ্ছভাবেই বলে রাখা ভালো, ফিল্মের ভেতরে কোথাও সরাসরি "কুয়াকাটা" লেখা নেই। ফলে এই শনাক্তকরণ কোনো একক ও চূড়ান্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং কয়েকটি পরোক্ষ প্রমাণ ও প্রেক্ষাপট মিলিয়ে করা একটি বিশ্লেষণ।

 

এই বিশ্লেষণের প্রথম ভিত্তি মানচিত্র। তৎকালীন ব্রিটিশ মানচিত্রে সুন্দরবন অঞ্চলের বিস্তৃতি দিঘা থেকে কুয়াকাটা হয়ে ভোলা উপকূল পর্যন্ত দেখানো হয়েছে, যা ফিল্মের নামকরণ "In the Sunderbans"-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

 

সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্রিটিশ মানচিত্র দেখা যাবে এখানে— মানচিত্র এক, মানচিত্র দুই এবং মানচিত্র তিন

 

দ্বিতীয় ভিত্তি ফিল্মনির্মাতার পরিচয়। এই ফিল্মের নির্মাতা উইলিয়াম মেইকেলজন ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট্রি সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর কাজের এলাকা ছিল বাংলা ব-দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের বনাঞ্চল জরিপ, যার মধ্যে বাকেরগঞ্জ, অর্থাৎ বর্তমান পটুয়াখালী-বরগুনা অঞ্চলও পড়ে।

 


তৃতীয় ভিত্তি প্রশাসনিক নথি। তৎকালীন বাকেরগঞ্জের কালেক্টর জে. টি. ডোনোভানের সংরক্ষিত ভ্রমণ-ডায়েরিতে ১৯৩০ সালে লতাচাপলি ও কুয়াকাটা অঞ্চলে একাধিক সরকারি সফরের উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি ইঙ্গিত দেয়, সেই সময় এলাকাটি প্রশাসনিক ও জরিপ-কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ডোনোভানের ডায়েরির নথি দেখা যাবে এখানে

 

চতুর্থ ভিত্তি নৌকার গঠন। ফিল্মে ব্যবহৃত নৌকাগুলোর চওড়া ও বাঁকানো তলদেশ খোলা সমুদ্রের ঢেউ সামলানোর উপযোগী, যা দক্ষিণ উপকূলীয় তথা পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ধাঁচের সৈকত-উপযোগী নৌকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

 

একাধিক পরোক্ষ সূত্র মিলিয়ে দেখা বিশ্লেষণ

ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রে মেদিনীপুর, তৎকালীন গোটা যশোর অঞ্চল অর্থাৎ বর্তমান খুলনা-বরিশাল এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল দেখানো হয়েছিল। মেইকেলজন কেবল ফিল্ম বানানোর উদ্দেশ্যে এই যাত্রায় বের হননি, তিনি মূলত ফরেস্ট ডিভিশন গঠনের কাজেই বেরিয়েছিলেন। এ কারণে সেই তথ্য ফিল্মের বিবরণীতে না থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই সময় বর্তমান কুয়াকাটাও এই অঞ্চলেরই অংশ ছিল।

 

ব্রিটিশদের তৈরি পৃথিবীর অন্যান্য মানচিত্রের মতোই সুন্দরবনের এই মানচিত্রেও কিছু গরমিল আছে। তবে সৌভাগ্যবশত এতে কুয়াকাটা ভূখণ্ডটি স্পষ্ট রয়েছে, পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত ও সুন্দরবনের পূর্ব দিকের শেষাংশও দেখানো হয়েছে।

 


সমীক্ষার সুবিধার্থে মেইকেলজন সব গুরুত্বপূর্ণ স্পটেই নেমেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডোনোভানের ডায়েরি থেকে প্রমাণিত হয়, তখন কুয়াকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট ছিল। মজার বিষয় হলো, ১৯৩০ সালে ডোনোভান লতাচাপলি ও কুয়াকাটায় বেশ কয়েকবার ভ্রমণ করেছিলেন। ভ্রমণের কারণ ডায়েরিতে স্পষ্ট করে লেখা না থাকলেও এটি সরকারি কাজেই হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, এবং বনবিভাগের ওই কর্মকর্তাকে সঙ্গ দেওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

চেহারা ও গায়ের রঙ নিয়ে প্রশ্নের ব্যাখ্যাও একই সূত্রে গাঁথা। ব্রিটিশরা ওই সময় কুয়াকাটা এলাকাকে "রাখাইন সেটেলমেন্ট" নামে অভিহিত করত, কারণ তখন এখানে রাখাইনরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ফলে ভিডিওতে দেখা মানুষদের রাখাইন জনগোষ্ঠীর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

 

ফুটেজের সময়কাল নিয়ে সংশয়ের জবাবও একই আর্কাইভ-তথ্যে মেলে। কারও কারও ধারণা এটি ১৯৮৫ সালের দিকের ভিডিও, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ব্রিটিশ ফিল্ম আর্কাইভের একটি ফুটেজ থেকে নেওয়া, যা ১৯৩০ সালে ধারণ করা হয়েছে বলে সংরক্ষণাগারেই লেখা আছে।

 


ভিডিওর এই নির্দিষ্ট অংশটি কুয়াকাটা বলে চিহ্নিত হওয়ার বড় কারণ মানুষের চেহারা ও নৌকার ধরন, কারণ এমন নৌকা মূলত কুয়াকাটা অঞ্চলেই পাওয়া যেত। এর চেয়েও বড় কারণ হলো ফিল্মের এই অংশে দেখা পাখিগুলো, যেগুলো সুন্দরবনের আশপাশে থাকে। দৃশ্যটি নদী মোহনার আশপাশে ধারণ করা, অথচ কক্সবাজার নদী মোহনা-অধ্যুষিত সৈকত হিসেবে পরিচিত নয়।

 

সেই সময় থেকেই কুয়াকাটা প্রসিদ্ধ, কারণ এখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একই স্থান থেকে দেখা যায়। সেই স্থানটি তিন নদীর মোহনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

১৯০৫ সালের একটি মানচিত্রেও দেখা যায়, নোয়াখালীর আগে ও বাকেরগঞ্জের নিচে বর্তমান ভারতের দিঘা থেকে কুয়াকাটা হয়ে ভোলা উপকূলে গিয়ে সুন্দরবন অঞ্চল শেষ হয়েছে। ফিল্মটির নামও দেওয়া হয়েছিল সুন্দরবনের নামেই।

 

মূল ভিডিওর দেড় মিনিট পর্যন্ত অংশে দেখা যায় দিঘা ও ভারতীয় ভূখণ্ড। এরপরের উন্মুক্ত সৈকতের দৃশ্য কেবল কুয়াকাটার ওই অংশেই মেলে। তার ঠিক পরের অংশে দেখা যায় পালতোলা নৌকা ও গরুর গাড়ি, সঙ্গে ধুতি পরা মানুষ, যা তৎকালীন বাংলায় বেশ প্রচলিত পোশাক ছিল।

 

কুয়াকাটা অংশে অবশ্য লুঙ্গি পরার ধরন অন্য অংশের থেকে আলাদা, কারণ রাখাইনদের পোশাকরীতিই এমন। এটিকে উখিয়া অঞ্চলের দৃশ্য মনে হতে পারে, কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ চট্টগ্রাম অংশের দৃশ্য শুরু হয়েছে ঠিক ছয় মিনিটের মাথায়, আর সেই অংশের শিরোনাম সৌভাগ্যক্রমে ফিল্মেই লেখা রয়েছে।

 

এই পয়েন্টগুলোর কোনোটিই এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তবে একত্রে মিলিয়ে দেখলে এগুলো কুয়াকাটার সম্ভাবনাকে জোরালো করে তোলে। বরিশাল নিউজ ডটকম এই শনাক্তকরণকে একটি বিশ্লেষণ-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই উপস্থাপন করছে, চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত প্রামাণ্য তথ্য, যেমন বিএফআইয়ের বিস্তারিত মাঠ-নোট বা তৎকালীন প্রশাসনিক নথি পাওয়া গেলে, প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

 

পাঠকদের প্রতি আহ্বান

এ ধরনের প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বলে মনে করে বরিশাল নিউজ ডটকম, আর তাই এই প্রশ্নগুলোকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ভিডিও বা এই প্রতিবেদন নিয়ে কারও কাছে অতিরিক্ত তথ্য বা সূত্র থাকলে তা মন্তব্যের ঘরে জানানোর অনুরোধ রইল।


 


মন্তব্য লিখুন


সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal