Advertise top
অর্থনীতি

অস্ট্রেলিয়ায় সৌর বিদ্যুতে বাজিমাত; বাংলাদেশ যা শিখতে পারে

বরিশাল নিউজ

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম    

অস্ট্রেলিয়ায় সৌর বিদ্যুতে বাজিমাত; বাংলাদেশ যা শিখতে পারে
অস্ট্রেলিয়ার একটি আবাসিক এলাকায় বসানো ছাদের সৌরপ্যানেল। সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ৮০ দশমিক চার শতাংশ চাহিদা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর মিটিয়েছে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ, যা নতুন এক রেকর্ড। এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের জন্য হতে পারে অনুকরনীয়।

 

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব উপকূলীয় রাজ্যগুলো, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও রাজধানী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী জাতীয় বিদ্যুৎ বাজারে (এনইএম) দুপুরের দিকে টানা আধা ঘণ্টা সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ মোট চাহিদার ৮০ দশমিক চার শতাংশ জোগান দেয়। এর মধ্যে ছাদের সৌরপ্যানেল একাই সরবরাহ করে মোট বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি, বাকিটা আসে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সামান্য জলবিদ্যুৎ থেকে। জীবাশ্ম জ্বালানি, অর্থাৎ কয়লা ও গ্যাস, অবদান রাখে মাত্র ২০ শতাংশ।

 

রিনিউ ইকোনমি ও এনার্জি ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন বলছে, শনিবারের ঠিক আগের দিন শুক্রবারও একটি রেকর্ড হয়েছিল, যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ পৌঁছায় ৭৯ দশমিক পাঁচ শতাংশে, আর পাঁচ মিনিটের তথ্যে তা কিছু সময়ের জন্য ৮০ দশমিক এক শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এর আগের রেকর্ড ছিল ৭৮ দশমিক ছয় শতাংশ, যা প্রায় এক বছর ধরে টিকে ছিল বলে জানায় সাউরএনার্জি।

 

জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন এই মাইলফলককে অভিহিত করেন এমন এক মুহূর্ত হিসেবে, যখন ঘরে ও ব্যবসায় আগের চেয়ে বেশি পরিচ্ছন্ন ও সস্তা জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী দিনে এমন মাইলফলক আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

 

এই পর্যায়ে পৌঁছাতে কত সময় লেগেছে

অস্ট্রেলিয়ায় ছাদের সৌরবিদ্যুতের যাত্রা শুরু হয় মূলত ২০০০-এর দশকের শেষভাগে ফিড-ইন ট্যারিফ ও সরকারি ভর্তুকি প্রকল্পের হাত ধরে। এরপর প্রায় প্রতিটি বছরই নতুন রেকর্ড স্থাপন করে খাতটি, যেখানে স্মল-স্কেল রিনিউয়েবল এনার্জি স্কিমের আওতায় পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে প্যানেল বসিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, এখন পর্যন্ত ৪৩ লাখের বেশি অস্ট্রেলীয় পরিবারের বাড়িতে ছাদের সৌরপ্যানেল বসানো হয়েছে।

 

অর্থাৎ, ৮০ শতাংশের এই মাইলফলক কোনো হঠাৎ অর্জন নয়, বরং প্রায় দেড় থেকে দুই দশকের ধারাবাহিক নীতি, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির দাম কমার ফসল।

 

আর্থিক সক্ষমতা কতটা লেগেছে

এই রূপান্তরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়েছে। শুরুর দিকে সরকারি ফিড-ইন ট্যারিফ ও সনদ প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু ছাদের সৌরে হাজার হাজার কোটি ডলারের ভর্তুকি দেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় বড় আকারের বায়ু ও সৌর প্রকল্পে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার করে বিনিয়োগ আসতে থাকে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ও বেসরকারি খাতের উদ্যোগে।

 

সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির দাম কমায় খরচও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যা ভর্তুকির প্রয়োজন কমিয়ে সাধারণ পরিবারের জন্যও প্যানেল বসানো সহজ করে তোলে।

 

সুফল কী পেল অস্ট্রেলিয়া

ফিনওয়্যারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভাগ বাড়ার সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৪৭ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিচ্ছন্ন হয়েছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের বিলও কমেছে। এছাড়া মন্ত্রী বোয়েনের ভাষায়, এই বিদ্যুৎ দেশীয় উৎস থেকে আসায় জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমেছে।

 

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা

ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এর লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে পৌঁছানো। সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির তথ্যে দেশের মোট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা মাত্র ১৭৮১ মেগাওয়াট, যার সিংহভাগ সৌরবিদ্যুৎ।

 

এই লক্ষ্য পূরণে বড় অঙ্কের অর্থায়ন দরকার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে, ২০৪০ সাল নাগাদ ৩০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ৩৫২০ থেকে ৪২৬০ কোটি মার্কিন ডলার, যার বেশির ভাগই দরকার হবে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে।

 

অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ধারাবাহিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি বা প্রণোদনা এবং গ্রিড অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ছাড়া বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জমি সংকট, দুর্বল অর্থায়ন কাঠামো ও সরঞ্জামে করভার এখনো এই রূপান্তরের প্রধান বাধা। তাই অস্ট্রেলিয়ার মতো ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ও পারিবারিক পর্যায়ের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার নীতি বাংলাদেশের জন্যও একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে।

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রিনিউ ইকোনমি, এনার্জি ম্যাগাজিন,সোউর এনার্জি, ফিনওয়্যার, দ্য ফাইন্যানসিয়াল এক্সপ্রেস (বাংলাদেশ)


 


মন্তব্য লিখুন


সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal